হাওজা নিউজ এজেন্সি’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, “আদর্শ সমাজের দিকে” শীর্ষক মাহদাভিয়াত বিষয়ক এই ধারাবাহিক আলোচনা, ইমাম যামান (আজ্জাল্লাহু তা‘আলা ফারাজাহুশ শরীফ)-সংক্রান্ত মা‘রেফাত ও জ্ঞান প্রচারের উদ্দেশ্যে সম্মানিত পাঠকমণ্ডলীর জন্য উপস্থাপিত হচ্ছে।
মাসূম (আ.)-গণের মূল্যবান বাণীতে হযরত ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর প্রকৃত প্রতীক্ষাকারীদের জন্য এমন উচ্চ মর্যাদা ও অবস্থানের কথা বর্ণিত হয়েছে, যা সত্যিই বিস্ময়কর। এতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—কীভাবে এই প্রতীক্ষার অবস্থাই এত মহান মূল্য ধারণ করতে পারে?
এখন রেওয়ায়াতের আলোকে প্রতীক্ষাকারীদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফজিলত ও বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হলো—
১. সর্বোত্তম মানুষ
গায়বাতের যুগে বিদ্যমান বিশেষ পরিস্থিতির কারণে, প্রকৃত প্রতীক্ষাকারীরা সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী।
ইমাম সাজ্জাদ (আ.) এ সম্পর্কে বলেন:
إِنَّ أَهْلَ زَمَانِ غَیْبَتِهِ وَ الْقَائِلِینَ بِإِمَامَتِهِ وَ الْمُنْتَظِرِینَ لِظُهُورِهِ عجل الله تعالی فرجه الشریف أَفْضَلُ مِنْ أَهْلِ کُلِّ زَمَان لِأَنَّ اللَّهَ تَعَالَی ذِکْرُهُ أَعْطَاهُمْ مِنَ الْعُقُولِ وَ الْأَفْهَامِ وَ الْمَعْرِفَةِ مَا صَارَتْ بِهِ الْغَیْبَةُ عَنْهُمْ بِمَنْزِلَةِ الْمُشَاهَدَةِ
“ইমাম (আ.ফা.)-এর গায়বাতের যুগের মানুষ—যারা তাঁর ইমামতে বিশ্বাসী এবং তাঁর আবির্ভাবের প্রতীক্ষায় থাকে—তারা সকল যুগের মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ; কারণ আল্লাহ তাদের এমন জ্ঞান, বোধ ও মা‘রেফাত দান করেছেন, যার ফলে গায়বাত তাদের নিকট প্রত্যক্ষ দর্শনের ন্যায় হয়ে যায়। [কামালুদ্দীন ও তামামুন নি‘মাহ, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩১৯]
২. আবির্ভাবের সময় তাঁর খেমায় উপস্থিতদের ন্যায় মর্যাদা
বিশ্বের সকল সৎ মানুষের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা হলো এমন এক যুগে উপস্থিত থাকা, যেখানে অন্যায়, অত্যাচার ও অনাচারের কোনো চিহ্ন থাকবে না। এই মর্যাদা তখন পূর্ণতা পায়, যখন কেউ আবির্ভাবের সময় আন্দোলনের নেতার—অর্থাৎ ইমাম মাহদী (আ.ফা.)-এর—নিকটতম অবস্থানে, তাঁর খেমায় উপস্থিত থাকতে পারে।
ইমাম সাদিক (আ.) সেই সকল প্রকৃত প্রতীক্ষাকারীদের সম্পর্কে, যারা গায়বাতের যুগে মৃত্যুবরণ করে, বলেন:
مَنْ مَاتَ مِنْکُمُ عَلی هَذا الْاَمْرِ مُنْتَظِراً کانَ کَمَنْ هُوَ فِی الفُسْطَاطِ الَّذِی لِلْقَائِمِ
“তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এই অবস্থায় (ইমামতের ওপর অবিচল থেকে) প্রতীক্ষারত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, সে ঐ ব্যক্তির ন্যায়, যে কায়েম (আ.ফা.)-এর খেমায় উপস্থিত আছে।”
[আল-কাফি, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ২২]
৩. নামাজি ও রোজাদারের ন্যায় সাওয়াব
সর্বোত্তম ইবাদতের মধ্যে নামাজ ও রোজা অন্যতম। রেওয়ায়াত থেকে জানা যায়, কেউ যদি তার জীবনকে আবির্ভাবের প্রতীক্ষায় অতিবাহিত করে, তবে সে নামাজি ও রোজাদারের মতো সাওয়াব লাভ করে।
ইমাম বাকির (আ.) বলেন:
وَاعْلَمُوا اَنَّ المُنتَظِرَ لِهذا الاَمْرِ لَهُ مِثْلُ اَجْرِ الصَّائِمِ القائِمِ
“জেনে রাখ, এই বিষয়ে প্রতীক্ষাকারীর জন্য সেই সাওয়াব রয়েছে, যা রোজাদার ও রাতজাগা ইবাদতকারীর জন্য নির্ধারিত।” [আল-কাফি, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২২২]
৪. উম্মতের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত এবং রাসূল (সা.)-এর সঙ্গী
মানবজাতির মধ্যে সর্বাধিক মর্যাদাসম্পন্ন হলেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। অতএব, যে ব্যক্তি ইন্তেজারের যুগে যথাযথভাবে জীবনযাপন করে, সে উম্মতের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত হবে এবং রাসূল (সা.)-এর সান্নিধ্য লাভ করবে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
... اُولئِکَ رُفَقائی وَاکْرَمُ اُمَّتی عَلَی
“তারা আমার সঙ্গী এবং আমার উম্মতের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত।” [কামালুদ্দীন ও তামামুন নি‘মাহ, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৮৬]
৫. আল্লাহর পথে মুজাহিদের মর্যাদা
আল্লাহর পথে সংগ্রামকারীরা মানবজাতির শ্রেষ্ঠদের অন্তর্ভুক্ত। এই মর্যাদা তখন আরও পরিপূর্ণ হয়, যখন তা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সান্নিধ্যে সংঘটিত হয়।
ইমাম হুসাইন (আ.) বলেন,
إِنَّ الصَّابِرَ فِی غَیْبَتِهِ عَلَی الْأَذَی وَ التَّکْذِیبِ بِمَنْزِلَةِ الْمُجَاهِدِ بِالسَّیْفِ بَیْنَ یَدَیْ رَسُولِ اللَّهِ ص
“যে ব্যক্তি গায়বাতের যুগে কষ্ট, নির্যাতন ও অস্বীকৃতির মুখে ধৈর্য ধারণ করে, সে ঐ মুজাহিদের ন্যায়, যে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সম্মুখে তরবারি নিয়ে জিহাদ করেছে।” [উয়ূনু আখবারির রিদা (আ.), খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৬৮]
৬. এক হাজার শহীদের সমপরিমাণ সাওয়াব
প্রকৃত প্রতীক্ষাকারী এবং আহলে বাইত (আ.)-এর বেলায়েতের ওপর অবিচল ব্যক্তিদের জন্য এমন সাওয়াবের কথা বর্ণিত হয়েছে, যা ইসলামের প্রারম্ভিক যুগের এক হাজার শহীদের সাওয়াবের সমতুল্য।
ইমাম সাজ্জাদ (আ.) বলেন,
مَن ثَبَتَ عَلی مُوالاتِنا فِی غَیْبَةِ قائِمِنا اَعْطاهُ اللَّهُ عَزَّوَجَلَّ اَجْرَ اَلْفَ شَهیدٍ مِنْ شُهَداءِ بَدْرٍ وَاُحُدٍ
“যে ব্যক্তি আমাদের প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্যে আমাদের কায়েমের গায়বাতের যুগে অবিচল থাকবে, আল্লাহ তাকে বদর ও উহুদের এক হাজার শহীদের সাওয়াব দান করবেন।” [কামালুদ্দীন ও তামামুন নি‘মাহ, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩২৩]
অতএব, প্রকৃত ‘ইন্তেজার’ কেবল একটি মানসিক অবস্থা নয়; বরং এটি এমন এক উচ্চ মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান, যা মানুষকে আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত করতে সক্ষম।
এই আলোচনা অব্যাহত থাকবে…
উৎস: ‘দারসনামা-এ মাহদাভিয়াত’, খোদা-মুরাদ সুলাইমান; সামান্য সম্পাদনাসহ।
আপনার কমেন্ট